সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে খালেদা জিয়ার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বৃহস্পতিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে তিনি প্রয়াত নেত্রীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় শোক বইয়ে স্বাক্ষর করে রাজনাথ সিং ভারতের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জানান। শোকবার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়া ছিলেন এক প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব, যাঁর ভূমিকা প্রতিবেশী দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে নিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
বাংলাদেশ হাইকমিশনে পৌঁছালে রাজনাথ সিংকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ। কূটনৈতিক মহলে কোনো বিদেশি প্রভাবশালী মন্ত্রীর সরাসরি বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে শোক প্রকাশকে তাৎপর্যপূর্ণ ও সম্মানজনক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে, ২০২১ সালে ভারতের সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে রাজনাথ সিং বাংলাদেশ মিশনে সফর করেছিলেন। ওই সফরকে দুই দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের সৌহার্দ্যপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের এই উচ্চপর্যায়ের শোক প্রকাশ ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন ইতিবাচক মাত্রা যোগ করতে পারে।
উল্লেখ্য, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত মঙ্গলবার রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরের দিন বুধবার খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়। এতে যোগ দেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকায় আসেন তিনি। পাশাপাশি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা হস্তান্তর করেন। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনাথ সিং ও এস জয়শঙ্করের এই ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগ বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিএনপির নেতৃত্বের প্রতি ভারতের বাড়তি গুরুত্বের ইঙ্গিত বহন করে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারে এ ধরনের কূটনৈতিক সৌজন্য ভবিষ্যতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জয়শঙ্করের সফর শুধুই সৌজন্যমূলক : পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফরকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা উচিত নয়। তিনি বলেন, এ সফর মূলত একটি সৌজন্যমূলক অংশগ্রহণ, যা দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক কোনো আলোচনার সূচনা নয়। সফরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমিত হবে কি না, তা আগামীতে দেখা যাবেÑ যোগ করেন তিনি।
গত বুধবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় উপস্থিত ছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। একই দিন ঢাকায় সফর করেন পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডিএন ডুঙ্গেল, মালদ্বীপের মন্ত্রী ড. আলি হায়দার আহমেদ, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা এবং শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিতা হেরাথ।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের প্রতিনিধি এসেছেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। সফর সংক্ষিপ্ত হলেও তিনি পুরো অনুষ্ঠানটিতে অংশগ্রহণ করেছেন। এটি একটি ভালো জেসচার (সংকেত); এ পর্যন্তই। এর থেকে বেশি কিছু খুঁজতে না যাওয়াই ভালো। এ সফরকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখার প্রয়োজন নেই।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও জানান, জয়শঙ্করের সঙ্গে কোনো একান্ত বৈঠক হয়নি। ওয়ান টু ওয়ান কথাবার্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি। অন্যান্য অতিথির সঙ্গেও সৌজন্যমূলক হাত মেলানো ছাড়া কোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ঘটনা ঘটেনি। আমাদের সংলাপে রাজনীতি ছিল না। পুরোপুরি সৌজন্যবোধ এবং অন্যদের উপস্থিতিতে হয়েছে, বলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
জয়শঙ্করের ঢাকা সফরের প্রভাব নিয়ে জানতে চাইলে তৌহিদ হোসেন বলেন, এর উত্তর আপনাদেরকে আগামীতেই খুঁজতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, বেগম খালেদা জিয়া শুধু বাংলাদেশেই নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোতেও একটি পজিটিভ ইমেজ রাখতেন। তিনি যে অবস্থান অর্জন করেছিলেন, তা দেশের মানুষ দলমত নির্বিশেষে গ্রহণ করতেন এবং শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার সবাই খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা স্বীকার করে। তাঁর মৃত্যু ও জানাজায় সবার অংশগ্রহণ স্বাভাবিক। আমরা এটিকে শুধু শ্রদ্ধার মধ্যেই দেখি, আর অতিরিক্ত রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।