বাংলাদেশে নিউমোনিয়া এখনও শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতিবছর প্রায় ২৪ হাজার শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। শিশুর দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবার সীমিত প্রবেশযোগ্যতা এবং অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের দেরিতে চিকিৎসা নেওয়াÑ এসব কারণ মিলেই এ মৃত্যুহার উচ্চতর থেকে যায়।
নিউমোনিয়া মূলত ফুসফুসের বায়ুথলিতে প্রদাহ সৃষ্টি করে শ্বাসক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না। ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা অন্যান্য প্যাথোজেনের কারণে এ সংক্রমণ ঘটতে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের প্রতিরোধক্ষমতা পুরোপুরি বিকশিত না হওয়ায় তারা এ সংক্রমণের প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল।
টঘওঈঊঋ এবং ওঊউঈজ-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট শিশুমৃত্যুর প্রায় ২৪ শতাংশই নিউমোনিয়াজনিত। এ পরিসংখ্যান আমাদের বাস্তবিক চ্যালেঞ্জকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের মাত্র ৬০ শতাংশ প্রাথমিক চিকিৎসা পায়; বাকিদের হয় চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সীমিত, নয়তো পরিবার পর্যায়ে চিকিৎসা গ্রহণে সচেতনতা ও সামর্থ্যরে অভাব। শীতকাল, ধুলাবালিযুক্ত পরিবেশ এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রোগের প্রকোপ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। কারণ এসব পরিবেশে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার সহজ হয় এবং শ্বাসতন্ত্র সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
নিউমোনিয়ার কারণ বহুবিধ। ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনিয়া এবং হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি (ঐরন) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রে রেসপিরেটরি সিনসিটিয়াল ভাইরাস (জঝঠ) এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস শিশুর জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করে। অনেক সময় খাবার বা তরল শ্বাসনালিতে ঢুকে পড়লে অ্যাসপিরেশনজনিত নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি ও ভিটামিনের ঘাটতি শিশুর রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ায় সংক্রমণ আরও জটিল হয়।
নিউমোনিয়ার লক্ষণগুলো সাধারণ সর্দি-কাশির মতো শুরু হলেও দ্রুত গুরুতর রূপ নিতে পারে। যেমনÑ জ্বর ও ঠাণ্ডা লাগা, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, দ্রুত বা কঠিন শ্বাসপ্রশ্বাস, বুকের ব্যথা, খাওয়ার আগ্রহ কমে যাওয়া এবং ক্লান্তিভাব। গুরুতর ক্ষেত্রে শিশুর ঠোঁট বা নখ নীলাভ হয়ে যেতে পারে, যা শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতির স্পষ্ট ইঙ্গিত।
চিকিৎসা পদ্ধতি সংক্রমণের ধরন ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা কার্যকর। শিশুর জ্বর নিয়ন্ত্রণে জ্বরনাশক ওষুধ ব্যবহৃত হয়। রোগী যদি শ্বাসকষ্ট বা অক্সিজেনের ঘাটতিতে ভোগে, তাহলে অক্সিজেন থেরাপি প্রয়োজন হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শ্বাসনালি খোলা রাখতে নেবুলাইজার বা ইনহেলার প্রয়োগ করা হয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ। দেরিতে চিকিৎসা শুরু করলে নিউমোনিয়া দ্রুত জটিল হয়ে শিশুর জীবনঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে নিয়মিত টিকাদান। নিউমোকোক্কাল ও ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি (ঐরন) এবং অন্যান্য গুরুতর সংক্রমণ প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য সুরক্ষা দেয়।