অতীতে মানুষের জীবন ও সভ্যতার গল্প সবসময়ই এক অদ্ভুত টান তৈরি করে। মহাকাশজয়, গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান কিংবা ভার্চুয়াল বাস্তবতার বিস্ময়—সবকিছুর মাঝেও প্রাচীন কোনো শহর যখন মাটির নিচ থেকে মাথা তোলে, তখন মনে হয় ইতিহাস যেন আবার নতুন করে শ্বাস নিচ্ছে। সম্প্রতি সেই রকমই এক অতীত-দরজা খুলেছে কাজাখস্তানের বিস্তীর্ণ কাজাখ স্টেপ অঞ্চলে। সেখানে আবিষ্কৃত হয়েছে ব্রোঞ্জ যুগের একটি শহর—সেমিয়ার্কা, যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর ধরে মাটির নিচে আড়ালেই ছিল।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল)-এর নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক একদল প্রত্নতাত্ত্বিক দল সম্প্রতি ব্রোঞ্জ যুগের এই বিশাল মানববসতির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেয়েছেন। গবেষকদের অনুমান, সেমিয়ার্কা ছিল ওই অঞ্চলের একটি বড় শিল্পকেন্দ্র, যেখানে বৃহৎ পরিসরে ব্রোঞ্জ উৎপাদন হতো। ইউরেশিয়ার এই অংশে ব্রোঞ্জ শিল্পের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল বলে মনে করছেন তারা।
অ্যান্টিকুইটি প্রজেক্ট গ্যালারিতে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, সেমিয়ার্কা প্রায় ১৪০ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত একটি পরিকল্পিত শহর। ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় ও কাজাখস্তানের তোরাইঘিরভ বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষকেরা প্রথমবারের মতো এ বসতির বিস্তারিত জরিপ প্রকাশ করেন। যদিও তোরাইঘিরভ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২০০০ সালের শুরুর দিকেই এ স্থানের অস্তিত্ব শনাক্ত করেছিলেন, তখন এর অনেক দিকই ছিল অনাবিষ্কৃত। ধারণা করা হচ্ছে, খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০০ সালের এই বসতি স্থানীয় যাযাবর জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন সম্পর্কে বিশেষ কিছু তথ্য দেয়, যা এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক বিবর্তন বোঝাতে সহায়ক।
গবেষণার প্রধান লেখক ও ইউসিএলের প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. মিলজানা রাদিভোজেভিচ বলেন, “সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এ অঞ্চলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারগুলোর একটি হলো সেমিয়ার্কা। এটি আমাদের প্রাচীন সমাজ সম্পর্কে ধারণাকে পুনর্গঠন করতে বাধ্য করছে।”
শহরটির টিকে থাকা অংশগুলোর মধ্যে রয়েছে দুই সারিতে সাজানো বড় আকারের আয়তাকার মাটির ঢিবি—প্রতিটি প্রায় এক মিটার উঁচু। ধারণা করা হয়, এগুলোর উপরেই অতীতে তৈরি হয়েছিল বহুকক্ষবিশিষ্ট বাড়ির ভিত্তি। এসবের পাশেই গবেষকেরা একটি বিশাল ভবনের ধ্বংসাবশেষও খুঁজে পেয়েছেন। ভবনটির ব্যবহার সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু জানা না গেলেও অনুমান করা হচ্ছে এটি হয়তো ছিল ধর্মীয় আচারস্থল, কোনো অভিজাত পরিবারের নিবাস বা জনসমাগমের স্থাপনা।
সহ-গবেষক ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যান লরেন্স বলেন, “সেমিয়ার্কার স্থাপত্য যে রকম নিখুঁত ও পরিকল্পিত, তা এই অঞ্চলের অন্য বসতিগুলোর তুলনায় অনেক ভিন্ন। এটি অত্যন্ত পরিশীলিত নগর পরিকল্পনার উদাহরণ।”
দীর্ঘকাল মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা এই শহর নতুন করে আলোয় উঠে এসেছে; আর এর প্রতিটি স্তর মানবসভ্যতার বহু পুরোনো গল্পের দিকে নতুন দরজা খুলে দিচ্ছে।
সূত্র: সায়েন্স ডেইলি